0000

আজ বঙ্গাব্দ,

চাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমুন্নত বাংলাদেশ ।। শাকিবুল হাসান

 

শুরু হয়েছে বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। বাঙালি জাতি ও সমগ্র বাংলাদেশের কাছে ডিসেম্বর অত্যন্ত গৌরবের একটি মাস। কেননা এই ডিসেম্বরেই সুদীর্ঘ ২৩ বছর ধরে বাঙালি জাতির সাথে চলা শারীরিক, অর্থনৈতিক, মানসিক ও রাজনৈতিক যুদ্ধের অবসান ঘটে। পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের ওপর প্রাদেশিক শাসন চালানোর ধ্যানে মগ্ন ছিল। তাই তারা ১৯৪৮ সাথে বাংলা ভাষার ওপর প্রথম আঘাত আনা হয়। ঠিক তখন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ অগ্নিশিখার ন্যায় জ্বলে ওঠে। পরপর কয়েকবার যখন তারা পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা ৫৬% লোকের মুখের ভাষাকে হরণ করে এক একক আধিপত্যের প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। ততকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় ৭ কোটি বাঙালির মনে চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়৷ বুকের মধ্যে জমতে থাকে অবিস্ফোরিত বারুদ। এই বারুদকে বিস্ফোরণের জন্য দরকার ছিল এক অগ্নিশিখার। যার এক ইশারায় দ্বপ করে জ্বলে উঠবে পূর্ব পাকিস্তানের সমগ্র বাঙালি জাতি। আআর সেই অগ্নিশিখা হয়ে আসেন স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের রূপকার, ততকালীন বাঙালি জাতির প্রদর্শক, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পুরো জাতিকে সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে দাবি আদায়ের পথ সুগম করেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই নেতা। উর্দুর পাশাপাশি বাংলা ভাষাকেও রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে। ১৯৫২ সালে তা অসহযোগ আন্দোলনে রূপ নেয়। শুরু হয় বাঙালির সংগ্রামী চেতনার বহিঃপ্রকাশ। বাংলার দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে রাজপথ রঞ্জিত করে। এ আন্দোলনের কাছে নত স্বীকার করে পশ্চিম পাকিস্তানি সরকার ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর থেকে পশ্চিম পাকিস্তানিদের  প্রতিটি অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক পদক্ষেপের দাঁতভাঙা জবাব দিতে শুরু করে বাংলার মানুষ। বাঙালি জাতির এই ঐক্যকে ভেঙে দেওয়ার অনেক অপচেষ্টা চালিয়ে প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে অসভ্য বর্বর পাক-হানাদার বাহিনী। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে নিজেদের প্রত্যেকটি দাবি আদায়ের সংগ্রামে বাংলার আপামর জনসাধারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। ৬৬–র দফা, যাকে বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ বলা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৬৮ সালে দায়ের করা হয় আগরতলা মামলা৷ যেখানে বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে সামরিক–বেসামরিক মোট ৩৫ জনকে আসামি করা হয়। এই মামলার নাম দেওয়া হয় রাষ্ট্র বনাম বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য। এরপর ১৯৬৯ সালের ছাত্রদের ১১ দফা দাবি সংবলিত গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পশ্চিম পাকিস্তান আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে আসামিদের নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়৷ পরবর্তীতে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব বাংলায় পশ্চিম পাকিস্তানের ভরাডুবি স্বাধীনতার পথ স্পষ্ট করে দেয়। সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় পূর্ব বাংলার মানুষ তাদের আর চায় না। তাই তো ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে জনসমুদ্র তৈরি হয় এবং তারা সরাসরি স্বাধীনতার ডাকের আশায় অপেক্ষা করে। কিন্তু অত্যন্ত বিচক্ষণ ও দৃঢ়চেতা বঙ্গবন্ধু সরাসরি ঘোষণা না দিয়ে প্রস্তুত হওয়ার ঘোষণার মাধ্যমে পরোক্ষ এবং ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে ঘোষণা দিলে বেতারযোগে তা সারাদেশে প্রচার করা হয়। পরদিন এই ঘোষণাপত্রটি চট্রগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন ততকালীন চট্রগ্রাম  আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান।  এরপরের দিন বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সেনাপ্রধান হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন জিয়াউর রহমান। শুরু হয় জনযুদ্ধ। আধুনিক অস্ত্রে সজ্জ্বিত  পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা নিরস্ত্র বাঙালি গেরিলার কাছে পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের আনুষ্ঠানিকতায় দেশ শত্রুমুক্ত হয়। কোটি বাঙালির স্বপ্ন পূরণ হয়। বিশ্বের মানচিত্রে এক টুকরো লাল সবুজের জন্ম হয়। যার নাম বাংলাদেশ। চলতি বছরের ১৬ ই ডিসেম্বরে আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর অর্থাৎ সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করতে যাচ্ছি। দেশ স্বাধীন করতে গিয়ে বাঙালি জাতির যে চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে বাঙালি জাতিকে বীরের জাতি বলে আখ্যায়িত করা হয়। প্রতি বছর ডিসেম্বর আসলেই শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। স্বাধীন জাতি হিসেবে আমরা গর্ব করি৷ এই স্বাধীনতা অর্জনে যেমন সংগ্রামী চেতনা, ঐক্যবদ্ধতার প্রয়োজন হয়েছে। ঠিক তেমনই এই স্বাধীনতা যুগ যুগ ধরে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বুকে ধারণ এবং অকৃত্রিম দেশপ্রেমের লালন। আমরা নিজেদের স্বাধীন বলে পরিচয় দিলেও প্রকৃতপক্ষে পরাধীনতা ও জড়তার বেড়াজালে বন্দী হয়ে গেছি। দেশের জন্য আমাদের যেটুকু ভালোবাসা, মাতৃভূমির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে তাও কৃত্রিমতা মুক্ত নয়৷ ইতিহাস বলে, দেশ সৃষ্টির ঊষালগ্নে দেশের জন্য আন্দোলন, সংগ্রাম ইত্যাদি সবকিছুর নেপথ্যে ছিল ততকালীন ছাত্রসমাজ। কিন্তু বর্তমানে ছাত্রসমাজ অতি আধুনিকতার স্রোতে গা ভাসিয়ে নিজ জাতির হাজার বছরের সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্যকে বিসর্জন দিতে বসেছে। তার প্রমাণ পাওয়া যায় জাতীয় দিবস গুলোতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শহিদ মিনার, বধ্যভূমি, স্মৃতিসৌধগুলোতে গেলে। এমনি সময়ে শহদী মিনারের বেদিতে বসে ছবি তুলে পেসবুকে আপলোড দিয়ে শ্রদ্ধা দেখানোতে কমতি নেই। কিন্তু ২১ শে ফেব্রুয়ারী, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর যোদ্ধাদের স্মৃতিস্তম্ভের সামনে দাঁড়িয়ে মহান শহীদদের স্মরণ করার মতো শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না। ছাত্রসমাজই একটি জাতি বা রাষ্ট্রের মূলভিত্তি। সেই হিসেবে ব্যক্তিত্বহীন আর চেতনাহীন ছাত্রসমাজ দেশ ও জাতির অদূর ভবিষ্যতে কি ফল বয়ে আনবে তা সহজেই অনুমেয়। ছাত্ররাজনীতির নামে চলা অপরাজনীতির কষাঘাতে ছাত্রসমাজ আজ জীর্ণশীর্ণ। যে রাজনীতির মধ্য দিয়ে এই দেশের জন্ম হয়েছে সে রাজনীতিকেই মানুষ এখন পঁচা নর্দমা মনে করে। কারণ দেশ সেবার নামে চলা রাজনীতি এখন পেশায় পরিণত হয়েছে। 

প্রযুক্তির উন্নয়নের উদ্দেশ্য হলো সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের জনজীবনকে সহজ ও সাবলীল করে তোলা। কিন্তু বর্তমান চিত্র তার উল্টো। প্রযুক্তির ওপর অতিনির্ভরশীলতার ফলে আমরা আমাদের স্বাভাবিক চিন্তাশক্তিকে অকেজো করে ফেলেছি। সুষ্ঠু মানসিক বিকাশেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা এখন প্রযুক্তির দাসত্ব করছি। কিছুদিন আগেও দেশের মানুষ যে-কোনো দাবি আদায়ের জন্য রাজপথে আনদোলন করতো। কিন্তু ইদানীং আমাদের আন্দোলন, দাবী আদায়ের প্রধান মাধ্যমে হয়েছে ফেসবুক। কোনো অনিয়ম বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটা পোস্ট দিয়েই আমরা ক্ষান্ত হয়ে যাই৷ এর ফলে বর্তমানের কোনো আন্দোলন থেকে তো আশানুরূপ ফল আসবেই না বরং ভবিষ্যতের আন্দোলনের পথও সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সেই সংগ্রামী চেতনার বিলুপ্তি ঘটছে। অন্যের দাসত্ব আর ব্যক্তিস্বার্থই এখন আমাদের স্বভাবে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের যে স্বপ্ন আর আকাঙ্ক্ষার মানসে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল, প্রকৃতপক্ষে সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন হয় নি। 

এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। আর এর থেকে পরিত্রাণ পেতে মুক্তিযুদ্ধের সমগ্র ইতিহাসকে ভালোভাবে জানতে হবে। একটি জাতিকে বদ্ধ শিকল থেকে মুক্ত করতে কত ত্যাগ তিতিক্ষার প্রয়োজন হয় সেটা অনুভব করতে হবে। নিজেদের মধ্যে সংগ্রামী চেতনা ও দেশপ্রেমের লালন করতে হবে। আমরা যে একটি জাতি সেই জাতিগত ঐক্য,  ভ্রাতৃত্ব তৈরি করতে হবে। ব্যক্তিস্বার্থ পরিহার করে দেশ ও জাতির জন্য ত্যাগের মানসিকতা তৈরি করতে হবে। দেশপ্রেমিক, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবীদের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে সব বিরোধ ও বিভক্তির ঊর্ধ্বে থেকে দেশের অগ্রগতি ও জনগণের কল্যাণে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচক যাতে ক্রমশ বৃদ্ধি পায় এবং দারিদ্রমুক্ত, সুশিক্ষিত, উন্নত দেশ গড়ে ওঠে সেজন্য একনিষ্ঠতার সাথে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলেই শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি আমরা যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে পারবো। এতেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা হবে গৌরবময়। 


শাকিবুল হাসান 
শিক্ষার্থী, বরেন্দ্র কলেজ, রাজশাহী 
প্রশিক্ষণ সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা 
আরো পড়ুন

Post a Comment

0 Comments

Back To Top