0000

আজ বঙ্গাব্দ,

বিজয় দিবসের সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশের অতীত ও বর্তমান ।। রাশেদুজ্জামান রাশেদ

 

আমরা নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি কথাটা যেমন চিরন্তন সত্য ঠিক তেমনি এটাও সত্য যে পাকিস্তানি দস্যুদের কাছে বাঙালিরা জুলুম, নির্যাতন, অত্যাচার, শোষণ আর বঞ্চিত হয়েছিল। এ কথা কেউ শুনেছি সরাসরি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে, কেউ শুনেছি নিকটতম আত্মীয় স্বজনের কাছে আবার স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ ইতিহাসের পাতায় পড়েছি। ফলে পাকিস্তানি শাসকের চরিত্র কেউ অবিশ্বাস করতে পারি না। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠির ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চ লাইট চালিয়ে ঘুমন্ত নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ ও গণহত্যার মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়। কেন যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল? এ যুদ্ধ তো একদিনে তৈরী হয়নি! পাকিস্তানি শাসক প্রথম নিরীহ বাঙালির অস্তিত্বের উপর আঘাত হানে যা হল ভাষা উপর। ওরা আমাদের মুখের ভাষা 'মাতৃভাষা' কেড়ে নিতে চেয়েছিল কারণ তারা জানত একটি জাতিকে ধ্বংস করতে হলে সেই জাতির ভাষাকে ধ্বংস করলেই যথেষ্ট। ফলে বাঙালিকে ধ্বংস করতে তাদের প্রথম নজর পড়ে ভাষার উপর। কিন্তু বাঙালি বীরের জাতি রক্ত দিয়ে জীবন দিয়ে মুখের ভাষা রক্ষা করেছিলেন। এর পর ৫৪ যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬২ শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০- এর নির্বাচনসহ দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জাতি ৭১ সালে এসে উপনীত হয়। অত্যাচার নিপীড়নের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলনে পরিণত হয়।

১৯৭১ সালের ২৫ থেকে জেনারেল নিয়াজির এক লাখ পাকিস্তানি সেনাসদস্য কিছু বাঙালি দালালদ অর্থাৎ রাজাকার, আলবদর ও আলসামদের নিয়ে বাঙালির উপর তাণ্ডব চালিয়ে ত্রিশ লক্ষ মানুষ জীবন ও দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রম কেড়ে নিয়েছিল। চারিদিকে ঘর বাড়ি জ্বালাও, পড়াও আর মানুষের কান্নার আওয়াজ এ দেশ যেন এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছিল। দেশের প্রতিটি মানুষ জীবন-মৃত্যুর শঙ্কা নিয়ে  খেয়ে না খেয়ে পথে ঘাটে ঘুরে বেড়িয়েছিল। পাকিস্তানি শাসক ধর্মের নামে 

রাজনীতি করে কৃষকের কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত করেছিল, শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত, চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত, সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত, নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি ইত্যাদি ঘোরতর অন্যায়-অবিচার ও চূড়ান্ত বর্বরতার মধ্যে দিয়ে পাকিস্তানিরা জাতাঁকলে পিষ্ট করেছিল। 

মানবমুক্তির স্বপ্ন নিয়ে দীর্ঘ নয় মাস পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম করে পাকিস্তানকে পরাজিত করেছিল বাংলার বীর মুক্তিযোদ্ধারা। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সেই দিনটিতে সারা দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা আনন্দে-উল্লাসে ফেটে পড়ে, অভ্যুদয় ঘটে বিশ্বের বুকে বাঙালির একটি স্বাধীন রাষ্ট্র যার নাম হয় বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলাদেশে তখন ভৌত-অবকাঠামো, রাস্তাঘাট-ব্রিজ-যানবাহন, বিদ্যুৎ ও টেলিফোন ইত্যাদি প্রায় সবকিছুই বিনষ্ট—বিধ্বস্ত। সেই সাথে বিশ্বমন্দা ও নানা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। বন্যা, খাদ্যাভাব, সামাজিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি। নিঃস্ব, সহায়-সম্বলহীন কোটি শরণার্থীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন ছিল বড় চ্যালেঞ্জ বিষয়। সেই চ্যালেঞ্জের বিষয় গুলো নিয়ে আমাদের দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সরকার গঠন করে এবং বিভিন্ন সরকারের পালাবদল করে আজকে স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ তম বিজয় দিবস চলছে। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে এসে স্বাভাবিক ভাবে একটা প্রশ্ন চলে আসে কেমন আছে বাংলাদেশ? মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কী দেশে শাসন ব্যবস্থা চলে?

রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের পবিত্র সংবিধানের চার মূলনীতি মধ্যে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ কী যথাযথ ভাবে কার্যকর আছে?

আমরা পাকিস্তান শাসকদের শাসন আমল ও বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশের শাসন আমল মূল্যায়ন করে দেখতে চাই। যে সত্যিকারে কী মানুষ শোষণযন্ত্র থেকে মুক্তি পেয়েছে? সম্প্রতি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দেখলে বুঝা যায় আমাদের দেশে চরমতম রাজনৈতিক অস্থিরতা, রক্তারক্তি, গুম ও খুন যেন নিত্যদিনের ঘটনা। ঘরে বাইরে নারী নির্যাতন, কলকারখানায় লুটপাট ও আগুনে শ্রমিকের কান্নায় বলে দিচ্ছে শ্রমিকরা শোষিত।  মুনাফাখোর, মজুতদার ও চোরাকারবারিদের দৌরাত্ম্যতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির অবিশ্বাস্য অগ্নিমূল্য। সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর মিছিল থেমে নেই। ফলে সড়কে ছাত্রদের চিৎকার ও কান্নায় সংবাদমাধ্যমে হৈচৈ। সুন্দরবন সহ প্রাণ প্রকৃতি ধ্বংস করে উন্নয়নের বাজিমাত। বারশত নদীর দেশে নদীগুলো বিলীন হয়ে খালে পরিণত, শিক্ষা ব্যবস্থা বাণিজ্যিকীকরণ, ধনী গরিবের বৈষম্য যেন পিরামিড আকৃতি, যৌন সহিংসতা থেকে আত্মহত্যা বেড়েই চলছে, দেশে গণপিটুনিতে হাজার হাজার মারা গেছে, শহরে বস্তির সংখ্যা বেড়েই চলছে, ধান চাষিরা ধানের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে ধানে আগুন ও আত্মহত্যার খবর কানে আসে। ফলে কৃষককের কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নেই, করোনাভাইরাস এসে চিকিৎসা খাতের নাজুক অবস্থা প্রকাশিত হয়েছে, গরিবের ত্রাণ চুরি, পাথর - কয়লা সহ জাতীয় সম্পদ চুরি, দুর্নীতি আর লুটপাট মহোৎসব ইত্যাদি সহিংসতা ব্যক্তি ও সমাজকে ক্ষত- বিক্ষত করেই চলছে। তাহলে এই সহিংসতা উপহার পাওয়ার জন্য কী আমাদের দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছিল? এখনও বেঁচে আছেন অনেক মুক্তিযোদ্ধা তাঁরা এই স্বাধীন দেশ নিয়ে খুবেই উদ্বিগ্ন কারণ তারা এখনও বলছে দেশের এই সহিংসতা দেখার জন্য তো যুদ্ধ করেনি। তাহলে মেনে নিতেই হচ্ছে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আজ বিপন্নতার পথে। 

মানুষ সহিংসতা বলতে কেবল শারীরিক খুন, জখমই বুঝে কিন্তু বাস্তবে সহিংসতা মানসিক ও আবেগগত ভাবে ঘটে। দেশের মানুষ রাষ্ট্রযন্ত্রের কাঠামোগত সহিংসতার শিকার হচ্ছে। কখনও কখনও সেই সহিংসতার বিরুদ্ধে রাজপথে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ করার চেষ্টাও করে। কাঠামোগত সহিংসতা থেকে মানুষকে মুক্ত করার জন্য প্রয়োজন একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শিক্ষাকে পণ্যে নয় সকলের মৌলিক অধিকার হিসাবে নিশ্চিত করা হবে, নারীকে পণ্য হিসাবে নয় মানুষ হিসাবে মানবিক মর্যাদা দিবে, চিকিৎসা সেবাকে বানিজ্যিক নয় মৌলিক অধিকার হিসাবে প্রাধান্য পাবে, কৃষককের কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবে, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি দেওয়া হবে, বেকারদের চাকরির ব্যবস্থা হবে, ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসন ব্যবস্থা হবে, মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, সর্বক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু থাকবে এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রাষ্ট্র পরিচালনা হবে তাহলে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় দিবসে আবালবৃদ্ধবনিতা আনন্দে-উল্লাসে আবারও ফেটে পড়বে। আমরা বাঙালি জাতি যে বীরের জাতি তা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব। মহান মুক্তিযুদ্ধ নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস। সেই প্রেরণাকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রের অতীত ভুল ভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি সুখি সমৃদ্ধশালী সাম্যের সমাজ ও দেশ গড়াতে জনগণের পাশাপাশি রাষ্ট্রকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখক : রাশেদুজ্জামান রাশেদ, 
শিক্ষার্থী, তৃতীয় বর্ষ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জয়পুরহাট সরকারি কলেজ, জয়পুরহাট। 
আরো পড়ুন

Post a Comment

0 Comments

Back To Top