সর্বশেষ

Monday, December 6, 2021

পথিক ।। স্বপন কুমার মোহন্ত

পথিক ।। স্বপন কুমার মোহন্ত


একাকীত্বতায়
ভূমিহীন জগতে -
শৈশব থেকে বার্ধক্যের দিকে, 
তিনপায় হেঁটে চলার চেষ্টা......

সমান্তরাল রেখায়-
পিতা-মাতা থেকেও
জ্বলন্ত অনুপস্থিতি অনুভবে, 
নিজের আমিত্বকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টায়
চলেছি অনন্তের পানে......

তবুও পথিক আমি পথ হারিয়ে
জীবন দিয়ে অনুভব করেছি-
নৈঃশব্দকে স্বাগত জানতে,
সুস্মিতাকে এড়িয়ে
একাকীত্বকে অনুভব করে চলেছি.....

মনের গহীন ভুবনে
জীবন দিয়ে অনুভব করেছি,
সুখের সাময়িক অনুপস্থিতিকে কষ্ট বলেও
নিজের আমিত্বটাকেই খুঁজেছি !

আলোর অনুপস্থিতিটাই অন্ধকার বলে
যদিও জীবনের গতি হ্রাস পাচ্ছে,
তবুও পথিক আমি  লক্ষ্যপানে
জীবনের পথে ছুটে চলছি.........

Friday, December 3, 2021

আনিছুর রহমানের চোখে শাহাজাদা বসুনিয়ার চন্দ্রা-মণি

আনিছুর রহমানের চোখে শাহাজাদা বসুনিয়ার চন্দ্রা-মণি


চন্দ্রা –মনি গল্পটি একাট ঐতিহাসিক পটভূমির উপর লেখা উপন্যাস। এক ভাগ্যহৃত নারী ও তার সন্তানদের জীবন সংগ্রামের নিষ্ঠুর ঘটনা প্রবাহ নিয়ে রচিত।
 
লেখক তৎকালিন দুর্বল  সমাজ ব্যবস্থা,  বৃটিশ শাসন, কুসংস্কার, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, নারীর প্রতি সামাজিক বৈষম্য , অনাচার ইত্যাদি তুলে ধরেছেন।
অন্ধ মোল্লাদের প্রতি সমাজের মানুষের অগাধ ভক্তি এবং নিরক্ষরতা গল্পের ঐতিহাসিক সন্ধি বহন করে ।যেহেতু লেখক ঐতিহাসিক লেখা হিসেবে উপস্থাপন করেছে সে হিসেবে স্থানগত অজানা পাঠকের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ কম । তারপরও ইমাম সাহেবের ছেলে উমরের এই ধরনের চরিত্র ফুটিয়ে তোলা পাঠককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

জোসনার প্রেম, বিয়ে, তার বাবার নদীতে নিখোঁজ অনেক বছর পর গুপ্তচরদের অপ্রয়োজনে ফিরে আসা, চন্দ্রার পতিতার পর্যায়ে চরিত্র রুপায়ন পাঠককে বাস্তবতার দিকে সন্দেহপ্রবন করে তোলে ।
সব মিলে চন্দ্রা-মনি চমৎকার একটি গল্প যা পাঠকের তৃপ্তি করার ক্ষমতা রাখে।

Tuesday, November 30, 2021

শীতের আবেশ ।। সাদিয়া আফরোজ

শীতের আবেশ ।। সাদিয়া আফরোজ


হেমন্তের নবান্ন শেষে 
শীতের আমেজ আসে যেন
বাতাসের গাঁ ঘেঁষে ঘেঁষে।

রাত্রি ভরা শিশিরের কণা
প্রভাতে মেলে কুয়াশার ফণা,
জড়িয়ে নেয় মানুষ তখন
 নিজেকে উষ্ণ গরম চাঁদরে,
শীতকাল ঠান্ডায় পোড়ায় অতি আদরে।

আগুনের তাপে তাই
 কেটে যায় শীত,
প্রভাতে সোনার রবি
হাসে ফিক ফিক।

হরেকরকম পিঠার পশলা
খেজুর রসের গুড়
সরিষা ফুলের দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য 
মনের শহরকে রাখে ফুরফুর।

সাদিয়া আফরোজ, শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
৮৩ তে পা দিলেন নিভৃতচারী লেখক হায়দার বসুনিয়া

৮৩ তে পা দিলেন নিভৃতচারী লেখক হায়দার বসুনিয়া


৮৩ তে পা দিলেন নিভৃতচারী লেখক হায়দার বসুনিয়া। নিভৃতপল্লীতে থেকেও যে সাহিত্য চর্চা করা যায় তার অন্যান্য উদাহরণ নিভৃতচারী লেখক হায়দার বসুনিয়া। সরকারি শহুরে চাকরি প্রত্যাখ্যান করে পেশা হিসেবে বেঁচে নেন গ্রামের মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকতা। শিক্ষকতার পাশাপাশি রাত জেগে করেছেন অমর সৃষ্টি। শিক্ষকতা থেকে অবসরে গেলেও থামেনি লেখালেখি। এখনো তিনি লিখে যাচ্ছেন অবিরাম।

হায়দার বসুনিয়ার জন্ম ১৯৩৯ সালের ৩০ নভেম্বর কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার মনারকুঠি গ্রামে। পিতা পন্ডিত জসিম উদ্দিন বসুনিয়া, মাতা আছিয়া খাতুন।

তিনি নাজিমখাঁন প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক, কুড়িগ্রাম রিভার ভিউ হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং গাইবান্ধা থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও বিএ পাস করেন।
হায়দার বসুনিয়া এক্সসাইজ ইন্সপেক্টর, ডিআইটি পদে কর্মজীবন শুরু করলেও মা ও মাটির টানে ফিরে আসেন নিজ গ্রামে। সৎ জীবনযাপনের লক্ষ্যে যোগদেন নাজিমখাঁন জুনিয়র হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষক হিসেবে। কিছুদিন শিক্ষকতার পর ময়মনসিংহ টি.টি কলেজ থেকে বিএড কোর্স শেষ করেন। আবারো সরকারি চাকরির হাতছানি আসলেও তিনি সেদিকে না ফিরে উলিপুর মহারাণী স্বর্ণময়ী বহুমুখী হাইস্কুলে (উলিপুর মহারাণী স্বর্ণময়ী স্কুল এন্ড কলেজ) সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম. এ, এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট হতে এমএড কোর্স সম্পন্ন করেন। উলিপুর মহারাণী স্বর্ণময়ী স্কুলে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা শেষে সেখান থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

তাঁর লেখায় পাওয়া যায় সাধারণ মানুষের দৈন্দিন ছুটে চলার গল্প, সমাজের গল্প, সামাজিকতার গল্প, আশা ও নিরাশার গল্প, ভালোবাসা ও হতাশার গল্প, মুক্তিযুদ্ধ ও মানবিকতার গল্প। এযাবৎ তিনি লিখেছেন ৫০ টিরও বেশি উপন্যাস। যার অর্ধেকই প্রকাশ পেয়েছে। নন্দিত হয়েছেন তিনি। জয় করে নিয়েছে পাঠকের মন। তিনি শুধু উপন্যাস লেখায় থেমে থাকেনি। লিখেছেন গল্প, কবিতা, নাটকসহ সাহিত্যের সকল শাখায়।

তার প্রকাশিত উপন্যাস নেপথ্যে লীলাময়, মেথর সমাচার, রাজাকারের মের্জাই বদল, দিগ্বিজয়ীর কান্না, হাতবদল, জালে ফেঁসেছিলো, পরী ডানাকাটা, সেতু, চলো যাই তেপান্তরের মাঠে, দুটো পোড়ো বাড়ির ইতিকথা, তুলো মনি, ভাগ্যান্বেষী ভবঘুরে, তিস্তা নদীর পাড়ে ও আপন মনের আরশি। কাব্যগ্রন্থ জেগে আছি, অমোঘ সায়াহ্ন, হংস সংলাপ ও রঙিন চশমা এবং ধর্মীয় প্রবন্ধের বই সিরাজম মুনিরা ও তাঁর উন্মতগণ উল্লেখযোগ্য।

বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য পেয়েছেন অরণ্য সম্মাননা ২০১৬, উলিপুর ডট কম সম্মাননা ২০১৭, ছোটনদী লেখক সম্মাননা ২০২১। 

নিভৃতচারী লেখক হায়দার বসুনিয়ার ৮২ তম জন্মদিনে বর্ণপ্রপাত'র পক্ষ থেকে জানাই শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি। 

জরীফ উদ্দীন, সম্পাদক, বর্ণপ্রপাত।

Monday, November 22, 2021

মায়াঘাটের মায়া বাঁশি ।। আসিফ ইকবাল আরিফ

মায়াঘাটের মায়া বাঁশি ।। আসিফ ইকবাল আরিফ

রাতের প্রায় শেষ সময়। এখনো ভোরের আলো ফোটে নি তবুও চারিদিকে কেমন যেনো আলো আলো ভাব বয়ে চলছে। আকাশের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে মিটমিটিয়ে জ্বলেই চলছে শুকতারা। হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই পূব আকাশের বুক ফেঁড়ে বের হওয়া সকালের সূর্যের আলোতে তা বিলীন হয়ে যাবে। আবার সন্ধ্যের কালেই আলো ছড়ানো শুরু করবে প্রাত্যহিক ধারার মতোই। এখন বৈশেখের দিন। দিনের খরতাপ শেষে রাত যতো গভীর হয়, পৃথিবী ততোই শান্ত হতে থাকে। আর এটাই নাকি নিয়ম। 

সারারাত ধরে ছাইচাপা ভ্যাঁপসা গরম পড়লেও এই সকালে বেশ আরামের বাতাস বয়ে চলছে। ভাটগাছের অতীত পাতা ঝরে গিয়ে নতুন কুশী ফুঁড়ে বের হয়েছে থকথকে কচি পাতা। আকন্দগাছে নতুন পাতা ডাল সমেত হেলে দুলে পড়েছে মাটির সাথে। দু’য়েকটা নতুন ফুলও ফুটেছে দেখা যাচ্ছে। তালতলায় গতকাল যে আশকেল গাছের ঝোপ ছিলো তা যেনো কেউ একজন কেটে সাবাড় করে দিয়েছে। আশকেল গাছের ঝোপ জ্বালানি হিসেবে বেশ ভালো। মাঝে মাঝে তো রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় এগুলোর দখল নিয়ে। তাল গাছটি থেকে একটু দূরে দু’য়েকটি ডুমুর গাছ থেকে শুধু ফঁসফঁস আওয়াজ আসছে। দক্ষিণা বাতাসে পাতার সাথে পাতার সংঘর্ষেই এমন শব্দ হচ্ছে বলেই যে এমনটি হতে পারে তা কিন্তু নয়। রাত-বিরাতের কথা! কতো সাপ, বিচ্ছু, অজগর, শিঁয়াল আর ব্যাঙের যে আড়ত তা চোখে না দেখলে বোঝা যাবে না হয়তো। তবে আপাতদৃষ্টিতে এমন শব্দে যে কোনো নির্জন মন-ই ভয় পেতে পারে। নদীর পাড়ের পাড়া-ঘরে যতোগুলো বাড়ি আছে – চালাক শেঁয়ালের পাল প্রায়ই বাড়ি থেকেই একটা দুইটা করে হাঁস-মুরগী দিন দিন ধরে নিয়ে আসে।

নদীর ওপারে মস্তকায় শীল কড়ই গাছের ডালে দু’য়েকটি শালিক, কাক, শকূন মাঝে মাঝেই ডেকে ডেকে উঠছে। শতবর্ষী তালগাছটির পূর্বধারের খালের পাড়ে গতবছরের ঝড়ে উপড়িয়ে পড়া কদম গাছটি একেবারে আড়াআড়িভাবে পড়ে এখনো ওপারে যাওয়ার সাঁকো হয়ে আছে। গাছটি এখনো বেঁচে আছে তবে কেউ তুলে খাড়া করে নি, দ্বিতীয়বার মাথা তুলে দাঁড়াবার সুযোগ করে দেয় নি।  খালে এখন জল নেই , নদীও শুকিয়ে গিয়েছে প্রায়। সুতরাং ঐ কদম গাছটিকে কেউ আর সাঁকো হিসেবে ব্যবহার করে না। তার প্রয়োজনও পড়ে না। বিকাল বেলা পাড়ার ছেলে-মেয়েরা এলাটিং বেলাটিং খেলে আদিম সময় পার করে গাছের চারপাশ ঘিরে।  অনেকেই আবার অপেক্ষায় থাকে গাছটি কবে পুরোপুরি মরবে। মকিমের বউ নাকি প্রতিদিন-ই একটা দুইটা করে ডাল ভাঙে আর নিজে নিজে অপরাধবোধে ভোগে। তাজা গাছের ডাল ভাঙতে কষ্ট হয় জেনেও সে ভাঙে, শুকোয়, তারপরে চুলায় দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে রান্নাবান্না করে। এই অপরাধ বোধের বিশা হাঁসফাঁস সে নিত্যদিন বহন করে নাকি বেঁচে থাকে। 

নবগঙ্গা নদীর পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই তালগাছটির দক্ষিণধারের জমিতেই দ্বিনু মুন্সীর বিশাল কাঁঠাল বাগান। বাতাসে কাঁঠালপাতা যেনো কেঁপে কেঁপে উঠছে। দু’য়েকটা শুকনো ডালও ভেঙে ভেঙে পড়ছে। এমন সময় হুট করেই একটা ভুঁতো শেঁয়াল সেলিনা বেগমের চোখের সামনে দিয়ে চলে গেলো। 

আজকাল প্রায় প্রায়-ই সেলিনা বেগম এই তালতলায় আসে। নবগঙ্গা নদীর এই মায়াঘাটের সাথে খুব ঘনিষ্ঠ সখ্যতা তার। বিশ বছরেরও বেশি সময়ের হাবভাব তার এই তালতলা জুড়ে। তার স্বামী হ্বিকমত আলী সাথে যখন বিয়ে হয়েছিলো তখন থেকেই। 

হ্বিকমত আলী এই গ্রামেরই ছেলে। সেলিনা বেগমের প্রয়াত স্বামী। বৈশেখ কিংবা জ্যৈষ্ঠ, ভাদ্র কিংবা আশ্বিন – যে সময়-ই বিছানায় মন ঠিকতো না হ্বিকমতের সেই সময়েই সে বাঁশি হাতে নিয়ে মনের আনন্দে বাজাতে থাকতো। গালমন্দ করে বিছানায় হ্বিকমতকে না পেয়ে সেলিনা বেগমও আসতো এই তালতলে। এক সময় সেলিনারও ভালো লেগে যায় বাঁশির সুর। বিশ বছর আগে হ্বিকমত যেদিন অকালে ধরাধাম ত্যাগ করে সেই দিনও হ্বিকমত নিশীথ রাতে এই তালতলে বাঁশি বাজিয়েছিলো। 

তখন নাকি বৈশেখের শেষ সময় চলছিলো। সারা রাতের গরমে ভালো ঘুম হলো হচ্ছিলো না হ্বিকমতের। বিছানায় খালি এপাশ-ওপাশ করছিলো। আর ঘুম তার হওয়ার কথাও ছিলো না। কাল সন্ধ্যেতে যে খবর সে শুনেছিলো – তাতে তার ঘুম তো হলোই না বরং দুশ্চিন্তা, রাগ আর ক্ষোভ একেবারেই পেয়ে বসেছিলো চোখ-মুখ জুড়ে। হ্বিকমত নাকি না ঘুমিয়েই সকাল অব্দি এখানে বসে থাকার জন্যেই এসেছিলো। 

হ্বিকমতের বয়স ছিলো তখন পয়ত্রিশ–ছত্রিশ বছরের মতো। পেশায় সে একজন ভ্যান চালক হলেও ক্ষেতখন্দও সে করতো। তখন ঘরে তার জোয়ান স্ত্রী সেলিনা ছিলো, ছিলো দুই ছেলেও। 

মৃত্যুর আগের সন্ধ্যে বেলাতে তার স্ত্রী সেলিনা বেগম সম্পর্কে সে যে তথ্য পেয়েছিলো তাতে করে তার মাথা একেবারেই বিগড়ে গিয়েছিলো। আর না বিগড়ানোর কোনো কথা ছিলো না। নিজের স্বামীকে কেউ নুন চিনি পড়া খাওয়ায়ে বশে আনতে চায়? তা আবার মহাতাব কবিরাজের মতো অমন পাকা বাণমারা কবিরাজের কাছ থেকে। তার বাণে গ্রামের ক্ষ্যাপা কুকুর মরে, পাগলা ষাঁড় মানুষ গুতানো বন্ধ করে দেয়, পাগলা ঘোড়া লাথি মারা বাদ দিয়ে দেয়, মহিষে দুধ দেওয়া বন্ধ করে, গাইয়ের দুধ কমে যায়, মানুষের পেট নামে, সুন্দরী মহিলারা স্বামী সংসার ছেড়ে তালতলায় রাত বিরাতে বসে থাকে, চোরে রক্তবমি করে চুরির মাল ফেরত দিয়ে যায়। হ্বিকমতকে আঁচলে বেঁধে বশ করে রাখার জন্যেই সেদিন সেলিনা মহাতাব কবিরাজের কাছ থেকে নুন চিনি পড়ে এনেছিলো তার মাকে দিয়ে। 

কিইবা এমন করেছিলো হ্বিকমত! খালি মরার আগে ভাদ্দর মাসে মজুর মেয়ে ফুলভানুর সাথে দুপুরবেলা নদীর ঘাটে গোসল করতে করতে হ্বিকমত একটু হেসে হেসে কথা বলেছিলো। আর শুধু হাসি ঠাট্টার কথা না হয় বাদই দিলাম মশকরা করে না হয় হ্বিকমতের গায়ে সাবান-ই ডলে দিছিলো ফুলভাণ তাই বলে সেলিনা হ্বিকমতকে বশীকরণ করবে? এটা কী হ্বিকমতের মান্য ছিলো? 

সেলিনা সেই দিনকার ব্যাপারগুলো ভালোভাবে নেয় নি উল্টো ফুলভাণ আর হ্বিকমতের আরো বারোবছর আগের প্রেম পিরীতির নাড়ী নক্ষত্র সব টেনে হেঁচড়ে বের করেছিলো। হ্বিকমত চ্যাংড়া বয়সে নিশীথ রাতে তালতলায় বাঁশি বাঝাতো, ফুলভাণ ঘর থেকে চলে যেতো। একবার নাকি নছিমের বউ হাতেনাতে ধরেও ফেলেছিলো তাদের। ফুলভাণ নাকি একেবারেই বিবস্ত্র ছিলো, পরণে লুঙ্গিটাও নাকি ঠিকঠাক ছিলো না হ্বিকমতেরও। দু’জন দু’জনের শরীরের সাথে নাকি লেপ্টে ছিলো স্যাঁতসেঁতে মাটির ছেদলার মতো। 

নছিমের বউ-ই নাকি পরে পুরো কাশীনাথপুর গ্রামের ঘরে ঘরে মাইক ছাড়া বলে এসেছিলো। পুরো গ্রাম একেবারেই তোলপাড় হয়ে গিয়েছিলো। দরবার বসেছিলো, বিচার-সালিশও হয়েছিলো। 

হ্বিকমতের ইচ্ছে ছিলো ফুলভাণকে বিয়ে করার কিন্তু ফুলভাণের পিতা মজু রাজি ছিলো না। কোনো রকম দণ্ড জরিমানা ছাড়া-ই শালিশ থেকে বের হয়ে সে মেয়েকে নিয়ে রেখে এসেছিলো বলরামপুরে তার শশুর বাড়ি। ওখানেই ফুলভাণের বিয়ে হলো। একমাস দুইমাস পরে হ্বিকমতও বিয়ে করলো পাশের গ্রামের ছানু মোল্লার মেয়ে সেলিনাকে।

হ্বিকমতের সাথে বিয়ের পরেই সেলিনা এই সব জানতে পেরেছিলো। প্রথম প্রথম মনে ব্যথা পেলেও সে মানিয়ে নিয়েছিলো। তবে বিয়ের বারো বছর পরে যখন দেখলো ফুলভাণ ঘনঘন বাপের বাড়ি আসতে শুরু করলো আর হ্বিকমতও কাজ-অকাজে বলরামপুর যেতে থাকলো – তখন-ই তার মনের ব্যথা চাগিয়ে উঠেছিলো। হ্বিকমতকে আরও কাছে ধরে রাখার জন্যেই সে নুন চিনি পড়ে এনেছিলো। এখনো এই কথা মনে উঠলে সেলিনার বুক ভেঙে যায়। দুই চোক্ষে শ্রাবণের ঢল নামে। 

হ্বিকমতের অমন মনোভিমানের দুই ঘণ্টা না পেরোতেই সেলিনার সংসারে ভয়ংকর এক দুর্যোগ নেমে এসেছিলো। এমন দুর্যোগ যা হয়তো স্বয়ং আল্লায় চেয়েছিলো যা থেকে উত্তরণের উপায় না ছিলো হ্বিকমতের, না ছিলো সেলিনার, না ছিলো পুরো কাশীনাথপুর গ্রামবাসীর। 

নির্ঘুম চোখ নিয়েই ভোর সকালে নিজের ভ্যানটা চালিয়ে নদীর ধার দিয়ে যাচ্ছিলো হ্বিকমত। সেলিনা বেগমও জোরারোপ করেও দু’মুঠো পান্তাভাত খাওয়াতে পারলো তার বাঁশিয়াল স্বামী হ্বিকমতকে। একেবারেই বাসিমুখে বের হলো হ্বিকমত। তার গন্তব্য ছিলো ঘোপের মাঠে। সেখানে হোসেন ব্যাপারী নতুন গাছ কেটে রেখেছিলো। হোসেন ব্যাপারীর তখন কাঠের ব্যবসা ছিলো। তার ব্যবসার পুঁজি আর পরিসর কম হলেও এই গাঁয়ের লোক তাকে না জানিয়ে কোনো গাছ বিক্রি করতো না। 

ঘোপের মাঠ - কাশীনাথপুর গ্রামের পূর্ব পাশে অবস্থিত। নদীর ওপাড়ের কাজী বাড়ির ঘাটের বিপরীতেই হোসেন ব্যাপারী একটি কাঁঠালগাছ কিনেছিলো। আগের দিন-ই গাছটি কেটে ঝুড়ে সাইজ করে রেখেছিলো তার লোকজন। হ্বিকমতকে বলেছিলো সেই গাছের গুড়ি বাজারের মিলে পৌছানোর জন্যে। দামদর কাড়ানোর দরকার ছিলো না কেননা প্রতি সিজনেই হোসেনের এমন কাজ হ্বিকমত অনেক বিশ্বস্ততার সাথে এমন কাজ করে যেতো। 

কাশীনাথপুরের পাড়া ঘরের ছেলে বুড়ো ছেমড়ি যুবতী ছোকড়ারা নিত্যদিন হ্বিকমতকে যেভাবে দেখে আসতো সেই দিনও সে সেইভাবেই ভ্যান নিয়ে যাচ্ছিলো নবগঙ্গার পাড় দিয়ে পেয়ো পথ ধরে। এই পেয়ো পথ ধরে চলে ফসল ঘরে তোলার গরুর গাড়ি, ফসলটানা সাইকেল, ভ্যান। আর রাত নেই, দিন নেই – এই পথ দিয়ে হেঁটে চলতো এপাড়ের মানুষ যাদের এখানে জমি আছে, ফসল তুলতে আসে, জমি চাষ করতে আসে, নতুন ফসল লাগাতে আসে, কেউ কেউ মজুরি খাটতে আসে, ঘাস কাটতে আসে, খড়ি কুড়াতে আসে আরও কতো কি! 

বিশাল মস্তকায় দেহো ছিলো হ্বিকমতের; লম্বায় ছ’ফুট, নিটুট শরীর আর সুঠাম দেহো। বর্ণে ছিলো শ্যামলা। দু’য়েক মণ ওজনের ভারী বস্তা সে একাই ঘাড়ের উপর তুলতে পারতো। 

ঘাড়ের উপরে লাল গামছা, পরণে ছিলো সাদা কালো দাগকাটা একটি নতুন লুঙ্গী। মনের ভেতরে কোনো একটা বিষ ব্যথার পোড়া গন্ধ থাকলেও উৎফুল্ল মনে সে গান গেয়ে গেয়ে ভ্যান চালিয়ে যচ্ছিলো। 

“ও বন্ধু,

মনের ঘরে চোর ঢুকাইলি

আমারে না চিই না রে

আমারে তুই বাণ মারিবি গুপ্তচরের বিষে রে

ও বন্ধু গুপ্তচোরা বিষে”। 

গলা ছেড়ে এমন করে গান গেয়ে যাওয়া তার জন্যে নতুন কিছু ছিলো না। যখন যেখানে আর যেদিকে যেতো, গান তার মুখ জুড়ে থাকতো। কতো রকমের গান যে সে জানতো তা কেবল তার নিজের-ই জানা ছিলো। আর যখন-ই তার একটু অবসর মিলতো তখন-ই সে মনের সুখে বাঁশি বাজাতো তালতলে এসে। ভরা বৈশেখ মাসের সেইদিন যেনো ভোরের রোদ আগুন হওয়ারই হুমকি দিচ্ছিলো প্রকৃতিকে। সদ্য এক পসলা বৃষ্টিতে তাজা হয়ে ওঠা দুবলো ঘাসগুলোর ডগাটে রোদে নেতিয়ে পড়ার ভয়ও ছিলো বেশ। ছোটো বড়ো ঝোপঝাড়গুলো আলেকলতার হলুদে ছেয়ে গিয়েছিলো। সকালের রোদে সেগুলো যেনো সোনার মতো ঝকমক করছিলো। নদীর জল যেনো শুকিয়ে একেবারেই হাঁটু পানিতে নেমে গিয়েছিলো। দু’য়েকটা শালিক কবুতর হালকা কাদা পানিতে পাখনা সাঁপ্টাতে সাঁপ্টাতে মনের তালে জলে খেলছিলো।  সারারাতের গৃহবন্দী সব হাঁসের পাল প্যাক প্যাক কলোরব তুলে ঘাটে নেমেছিলো; ডুব দিয়ে দিয়ে শামুক তুলে খাচ্ছিলো, পুঁটি আর বেলে মাছ পেলেও খাচ্ছিলো, কেউ কেউ জলের উপর সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছিলো, ডিম দেওয়া হাঁসীরা আবার বাগ নিয়ে ডিম পাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। 

হ্বিকমতের সাথে ছিলো নেকবর আর সাদেক আলী। হোসেন ব্যাপারীর কাজগুলো তারা একসাথেই করতো। হ্বিকমতের কাজ ছিলো ভ্যান বেয়ে গাছের ডুম (লগ) বাজারে পৌছানোর আর নেকবর আর সাদেক গাছ কাটতো, সাইজ করতো, ভ্যানে তুলে দিতো যত্নের সাথে। 

মায়াঘাটের তালতল দিয়ে যখন ভ্যানের চাকা ঘুরে চলছিলো ঠিক অমন সময়েই সামনের চাকার তলে পড়ে পিষ্ট হলো প্রায় দিন সাতেক আগে জন্ম নেওয়া একটি ঘুঘুর ছানা। 

হ্বিকমত ভ্যান থেকে নেমে পড়লো। মনের ভেতরে তার খচখচ করতে লাগলো। নিজ সন্তান শোকের মতো কোনো বেদনা তার মনের গোপনে জেগে ওঠার প্রকাশ পেলো চোখ আর মুখ জুড়ে।

 ‘মরছে! মরছে! চলতো। বালের! পাখির ছা মরছে আর তাতেই এমন ভাব দেখাচ্ছে যে মনে হয় মানুষ মরছে’ – নেকবরের এমন কথা শুনেই হ্বিকমত আড়চোখে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলো।

 ‘এ মরণে তোর কোনো হাত নেই। আচমকা হয়ে গেছে। আল্লায় তোরে গুনাহ দিবে না। চল তো’ – সাদেক আলী এই বলার পরে হ্বিকমত আবার ভ্যান চালাতে শুরু করলো। 

না খাওয়া পেট ছিলো হ্বিকমতের। এক গ্লাস পানিও খায় নি সেই ভোর সকালে। শরীর দিয়ে ঘাম ঝরেই চলছিলো তার। নেকবর আর সাদেক আলীর মতো দু’জন জোয়ানকে নিয়ে হাওয়ায় ভর্তি টায়ার চেপে সে যাচ্ছিলো। ভ্যানের প্যাডেল ঘোরাতে যে কষ্ট হচ্ছিলো তা সে বুঝতে পারছিলো। তবুও সে তাদেরকে বুঝতে দিলো না। আর কাউ বুঝতে না দেওয়ার কাজটা হ্বিকমত খুব ভালোই পারতো। বিশেষ করে দুঃখ আর কষ্ট। ওর মনের মনের মধ্যে হয়তো বিশাল একটা গোডাউন ছিলো। দুঃখ আর কষ্ট লুকানোর গোডাউন। তবে সুখ আর আনন্দ একেবারেই আড়াল করে রাখতে পারতো না। 

তারা গন্তব্যে পৌছালো। গাছের গুড়ি ভ্যানে তোলার জন্যে যা যা দরকার ছিলো তা আবার ভালো করে দেখেশুনে নিলো। নেকবরকে পজিশন মতো ভ্যান রাখতে বলে সাদেকের থেকে একটি বিড়ি নিয়ে একটু আয়েশে ফুঁকতে লাগলো হ্বিকমত। জর্দা মেশানো একটা পান পেলে তার ভালো লাগতো কিন্তু সে স্বাদ তার আর মিটলো না। ধুমধাম ক’য়েকটা সাড়া টান দিয়েই বিড়ির মোথা ফেলে দিলো সে। গাছের গুড়ি তুলতে হবে, তাড়াতাড়ি বাজারে নিয়ে যেতে হবে – এমন চিন্তাই যেনো কেবল ঘুরপাক খাচ্ছিলো তার মনে। 

গুড়ি তোলার আয়োজন শেষ হয়েছিলো। নেকবর আর সাদেক এক মাথা ধরলো আর অপর মাথা নিজে একা-ই ধরেছিলো হ্বিকমত। ভ্যানের ক্যাচিং এর সাথে বাশের ডুম লাগিয়ে ঠেলে ঠেলে ভ্যানের উপরে তুলছিলো তারা। এর আগেও তারা যখন গাছ তুলতো ঠিক এইভাবেই তুলতো ছোটো আর মাঝারি গুড়িগুলো। নিতান্তই বড়ো গুড়ি হলে হোসেন ব্যাপারী আরও লোক দিতো। তবে সেইদিন কে জানতো যে অমন মাঝারি গোছের কাঁঠালগুড়িটির ভার হ্বিকমত নিতে পারার মতো ছিলো না! 

কাঁঠাল গাছের ডুমটি প্রায়ই ভ্যানের বডিতে উঠেই গিয়েছিলো। আচমকা বিপদ ঘটালো হ্বিকমতের ডান পায়ের স্যান্ডেলটি। হাঁটু গেড়ে পড়ে গেলো সে। হাতের ভর হারিয়ে গুড়িটির এক মাথা পড়ে হ্বিকমতের মাথার উপর। হ্বিকমতের পা পিছিলিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই গুড়িটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিলো নেকবরদেরও। 

ভয়ংকর আর্তনাদের চিৎকারে আরও ক’য়েকজন জড়ো হয়েছিলো মুহুর্তেই। থেঁতলে যাওয়া মাথার উপর থেকে সবাই যখন গাছের গুড়িটি সরিয়েছিলো তখন আর হ্বিকমতকে চেনার উপায় ছিলো না। হাত-পায়ের আঙ্গুল ডগাগুলো খেজুরের পাতার মতো কেঁপে কেঁপে উঠছিলো, রক্তে ভিজে যাওয়া ঠোঁট দুটো মাছের পরাণের মতো নড়ছিলো। 

সেই সময়ে মাঠে বাড়িতে দোকানপাটে যারা ছিলো – সবাই ছুটে এসেছিলো ঘটনাস্থলে। নেকবর কাঁদতে কাঁদতে ভ্যান চালিয়ে চলছিলো। সাদেকের কোলের উপর ছিলো কাঁতরাতে থাকা হ্বিকমতের থেঁতলে যাওয়া মাথা। 

তালতলে ভ্যান আসতেই হ্বিকমতের বউ সেলিনা আর তার দুই ছেলে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো। তাদের কান্নার আওয়াজে মায়াঘাটের দুইপাড় ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছিলো, বৈশেখ সকালের রোদ যেনো কান্নায় ভিজে যাচ্ছিলো। 

মায়াঘাটের তালতলে আসতেই হ্বিকমত মাগো বলে বোবা চিৎকার দিয়ে উঠলো। একজন দৌড়িয়ে এসে মায়াঘাটের একেবারে তলের স্বচ্ছ জল এনে হ্বিকমতের চোখমুখে দিলো। ঠিক সেই জায়গাতেই এসেই হ্বিকমতের দম বন্ধ হলো যেখানে দম বন্ধ হয়েছিলো সেই ঘুঘু ছানাটির। 

মায়াঘাটের উপরে ঠিক একশো গজ দূরের হ্বিকমতের বাড়ি ছিলো। বাড়িতে লাশ নিয়ে গেলো। ভাই-ভাগার আত্মীয় স্বজন সবাই কান্নার রোল জুড়ে দিলো।

দূর-দূরান্তের আত্মীয় আর অনাত্মীয় বন্ধু স্বজনেরা ছুটে এসেছিলো শেষ দেখা দেখবে বলে। কবর খোড়া হলো, লাশের গোসল করানো হলো, কাফনে মোড়ানো হলো বাঁশিয়ালকে। তবে লাশ দাফনের ঠিক দুই ঘণ্টা আগে বাগড়া বসিয়েছিলো কাশীনাথপুর মসজিদের ইমাম মওলানা ছবির উদ্দিন মণ্ডল। হ্বিকমতের জানাযা পড়ানোর জন্যে তিনি রাজি ছিলেন না কেননা হ্বিকমত বাঁশি বাজাতো, গান গেতো। এছলামের দৃষ্টিতে এইগুলো হারাম কাজ!  সে জেনে বুঝে হারাম কাজের সাথে জড়িয়ে ছিলো। তিনি অনেকবার নিষেধ করার পরেও হ্বিকমত তার কথা শোনে নি জীবিত কালে। “একশো ভাগের মুসলমানের গ্রাম হচ্ছে কাশীনাথপুর! বেধর্মীর চাল-চলনে গ্রাম নষ্ট করেছে যারা তাদের জানাযাতে যাওয়া অসম্ভব। তবে যদি কেউ তার পক্ষে তওবা পড়ে তখন যেতে পারি’ – মওলানার এমন কথাতে পরে হ্বিকমতের বড় ভাই জুম্মত আলী মৃতের পক্ষে তওবা পড়ে তারপর মওলানাকে নিয়ে এসে জানাযার কাজ শেষ করলো। 

কাশীনাথপুর গ্রাম যে একশো ভাগ মুসলমানের গ্রাম তা এখন সত্য। এই গ্রামে কোনো হিন্দু বসতি নেই, নেই অন্য ধর্মের মানুষও। নিতান্তই খুব দরকারে না পড়লে কোনো হিন্দু লোক এই গ্রামে আসে না। তবে লোকশ্রুতিতে আছে ঊন্নিশো সাতচল্লিশের আগে এই গ্রাম জুড়ে পুরোপুরি হিন্দুদের বসতি ছিলো। সাত চল্লিশের দাঙ্গায় কুমোর পাড়ার হিন্দুরা যখন সব বেচে-ছেঁচে ওপারে মানে ভারতে চলে যায় তখন থেকেই মুসলমানের বসবাস শুরু হয় এখানে। তবে গ্রামের নামটি সেই কুমোরদের দেওয়া  কাশীনাথপুর-ই রয়ে গিয়েছে।  এখনো এই গ্রামের অনেকের বসতভিটার মাটি খুড়লে কুমোরদের হাঁড়িকুঁড়ি বানানোর চাঁচ পাওয়া যায়, ভাঙাচোরা মাটির জিনিসপত্র পাওয়া যায়। 

‘আজ মানিক সোনা ওখানে না গেলে মরতো না। দূষী ঘাটপাড়ের দূষী গাছ। ঐ গাছ-ই কেড়ে নিলো আমার মানিককে। আমার বাঁশিয়ালকে’ – সেলিনা বেগমের এমন বিলাপেই চরণ মুন্সীর বউ বলেছিলো ‘মরণের কথা চরণে কয়। যার যেখানে মরণ হয় সে সেখানেই যায়’ – এমন সান্ত্বনা বুকে নিয়েই বাঁশিয়াল হ্বিকমতকে তালতলা থেকে একটু দূরে কবর দিয়ে রেখে আসলো সেলিনা বেগম আর গ্রামবাসী।

হ্বিকমতকে কবরে রেখে বেশ কিছুদিন ঘুম হয় নি সেলিনার। ঘুম না হওয়ার-ই কথা। ছেলে দুটোকে বুকে করে স্মৃতিচারণ করেছে, পাগলের মতো ঘুরে বেড়িয়েছে সেই সময় সে। শরীকের লোক, বাপ পুরুষের লোক যারা পেরেছে তারা সান্ত্বনা যুগিয়েছে। স্বামীর ভিটে মাটি ছেড়ে না গিয়েই আঁকড়ে ছিলো সে কাশীনাথপুর গ্রামে। 

হ্বিকমত মরে যাওয়ার পরে ভালো রকমের পরিবর্তন এসেছিলো নেকবর আর সাদেকের জীবনে। নিষ্ঠুর হৃদয়ের নেকবর পাঁচ ওকাক্ত নামাজ পড়তে শুরু করেছিলো। নিয়ম করে মসজিদে যেতো। সাদেকও যেতো। নেকবরের মনে আফসোসবোধ কাজ করতো খুব। মৃত্যুর ভয় তার মনেও ঢুকেছিলো। কিন্তু সময়ের টানে আবার তারা আগের মতো হয়ে গিয়েছিলো; সপ্তাহে জুম্মার নামাজ, রোযার চাঁদে ঈদের নামাজ, আর কুরাবানী ঈদে নামাজ-ই পড়তো, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা তাদের আর হয়ে ওঠে নি নিয়ম করে।  

হ্বিকমত মরে যাওয়ার ঠিক চার মাস পরে শ্রাবণের ঢলে ভরে গেলো নবগঙ্গা নদী। মায়াঘাটের তালগাছের গোড়াতে পানি উঠে গেলো। খাল-বিল পুকুর পানিতে ভেসে গেলো। এমন এক কাল সন্ধ্যে বেলায় হারিয়ে যাওয়া কালো ছাগল খুঁজতে এসে সর্প দংশনে মরে গেলো হ্বিকমতের বড় ভাই জুম্মতের স্ত্রী ছখিনা বেগম। 

আগে হ্বিকমতের মৃত্যু আর পরে জুম্মতের বউয়ের মৃত্যুতে তোবাহারের বাড়িতে শোকের মাতুম লেগেই থাকলো। এই মৃত্যু শোক যেনো তার পিছু ছাড়ছিলো না। জুম্মতের ঘরে তখন পনেরো বছরের এক কন্যা ছিলো। 

এর ঠিক মাস খানেক পরে কাশীনাথপুর গ্রামে এক বিশাল ঘটনা ঘটেছিলো। একদিন নিশীথ রাতে বাঁশির সুরে পুরো গ্রাম জেগে উঠলো। তালতলে জড়ো হলো পাড়াঘরের ছেলে বুড়োরা। দূরে মহিলারাও দাঁড়িয়ে ছিলো। 

‘ভরা গাঙের মতো যৌবন তোমার এখনো। রাত-বিরাতে বাঁশি বাজালে তো গ্রামের আইবুড়ো ছেলেরা নষ্ট হয়ে যাবে, গ্রামের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাবে।‘– আজরত মণ্ডলের কথাতে সবাই একজোরে হ্যাঁ হ্যাঁ বলেছিলো সেই দিন। 

ভোর সকালেই শালিশ বসলো গ্রামে। স্ত্রী লোক হয়ে সেলিনার এমন বাঁশি বাজানোর স্পর্ধা গ্রামের মণ্ডল মাতুব্বরেরা ভালো ভাবে নিলো না। ছিঃ! ছিঃ! পড়ে গেলো মৃত হ্বিকমতের নামে। হ্বিকমতের পিতা-মাতা লজ্জায় পড়ে গেলো। সেলিনা বসে থাকলো অসহায়ের মতো। মেয়ে মানুষ হয়ে বাঁশি বাজানোর অপরাধে তাকে বড় শাস্তি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো সবাই তখন। 

‘মেয়েছেলে মানুষ হয়ে রাত-বিরাতে তোমার এমন কর্মে জাত মান তো আর কিছুই থাকলো বউ’ – শ্বাশুড়ীর এমন জিজ্ঞাসে নির্বাক হয়ে গেলো সেলিনা। জয়নাল মাতুব্বর ছিলো তাদের শরীকের লোক। গ্রাম থেকে বের করে দেওয়া বা একঘোরে করে রাখার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত না নিয়ে ভরা মজলিশে প্রস্তাব রাখলো – ‘আমাদের জুম্মতের সাথে সেলিনার দ্বিতীয়বার বিবাহ পড়িয়ে দিলেই মনে হয় ভালো হবে’। সিংহ ভাগের চিন্তাতেই স্বল্পের উপবাস – সবাই রাজি হয়ে গেলো। জুম্মতও মেনে নিলো আর সেলিনাতো এমনিতেই মানতে বাধ্য ছিলো। 

গ্রামবাসীর এমন সমাধানে সেলিনার পিতা-মাতা আর আত্মীয় স্বজনেরা যেনো হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলো সেই দিন। হ্বিকমতের বড় ভাই জুম্মতকে জামাই হিসেবে মেনে নিলো। ধীরে ধীরে সেলিনাও ভাসুরকে স্বামীর অধিকার দিয়ে আপন করে নিলো, আবার সংসারের সাথে মিশে গেলো, গ্রামবাসীর অনেকেই স্বাভাবিকভাবে বরণ করে নিলো। 

এখনো রাত-বিরাতে তালতলে আসে সেলিনা। আজকে যেমন এসেছে। জুম্মতও আসে মাঝে মাঝে। তবে জুম্মত আজ আসে নি। জুম্মত আর সে আপন মনে আপন জনের স্মৃতিচারণ করে। হ্বিকমতের সাথে সেলিনার মায়া ছিলো সংসারের, মনের আর যৌবনের। তবে জুম্মতের সাথে হ্বিকমতের সম্পর্ক ছিলো রক্তের। রক্তের সম্পর্কের সাথে যদি মনের সম্পর্ক শক্ত হয়ে ওঠে তা হয় মধুর সম্পর্ক, আত্মার সম্পর্ক। এই মায়াঘাটের নদীতেই তো সে আর তার ভাই একসাথে বড় হয়েছে। নদীতে ডুবে ডুবে জলখেলা করেছে, সাঁতার কেটে বেড়িয়েছে। দুই ভাই একসাথে মিলে বাপ-মায়ের হাতে মার খেয়েছে। তাদের দুই ভাইয়ের কৈশর আর যৌবন যেনো এখনো এই নদীতে ভেসে বেড়ায়। 

আর শুধু হ্বিকমতের কথা-ই বা কেনো? জুম্মতের মেয়ে সুবাহার মায়ের মৃত্যুও তো এখানেই হয়েছিলো এই তালতলে, মায়াঘাটের তালতলে যার সাথে তার সংসারের সম্পর্ক ছিলো, ছিলো যৌবনেরও।  

এই তো কিছুদিন আগে আধপাকা ভরা মাথার চুল নিয়ে বলরামপুর থেকে ছুটে এসেছিলো ফুলভাণ। ফুলভাণ অবাক শশী হয়ে এই তালতলে বসে মনে মনে কি যেনো ভাবছিলো, চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিলো। ‘লোক কূল আর জাত সমাজ জিতলে প্রেমের মরণ হয় না। টেকসই হয় মনের রঙ। মনের দাগ মোছে না’ – এমন করে বলছিলো মায়াঘাটের দিকে তাকিয়ে। 

সে হয়তো হ্বিকমতের কথা-ই ভাবছিলো এতোদিন বাদে। সেই যে ছুকড়ি বয়সে হ্বিকমত তার মনে দাগ কেটেছিলো! এখনো তার মনে হয় - হ্বিকমত যেনো এখনো বাঁশি বাজায়, তারে নাম ধরে ডাকে। স্বামী সংসারে জান দিয়ে খেটে মরে সে সংসার গুছিয়েছে, বালবাচ্চা মানুষ করেছে। তবে গভীর ঘুমে হলেই তালতলের সেই রসের পিরীত তার চোখের কোণে, মনের দুয়োরে সতেজ হয়ে লেগে থাকে। হয়তো হ্বিকমতের কাছাকাছি সে থাকতে পারি নি কিন্তু মন থেকে মুছতে পারে নি প্রেম নামক বটফলের কষ।  

মায়াঘাটের কোল জুড়ে এখন আর আগের মতো পানি থাকে না। শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে গাঙ একটু ভরা থাকে। মাঝে মাঝে পানি তালতলে এসে ঠেকে। তবে বাকি মাসগুলোতে বড্ড যৌবনহীন হয়ে পড়ে থাকে এই মায়াঘাট। 

এখন ঘরে ঘরে নলকূপ এসেছে। সকাল সকাল আগের মতো করে কেউ আর থালা-বাসন ধুতে আসে না, লোক লজ্জাকে লুকিয়ে স্বামীর পাহারায় কোনো বউ আর এখন ভোরের গোসল করতে আসে না। তবে বর্ষাকালে এখনো কেউ কেউ সখের বশে গোসল করতে আসে। কিশোর বয়সের ছোকড়ারা সাঁতার কাটে। কিশোরীরা তেমন একটা আসে না। আর জীবন-জীবিকার টানে এই গ্রাম ছেড়ে যারা শহরে চলে গেছে তারাও এখনো গ্রামে আসলে অন্তত একবার হলেও গোসল করে এই মায়াঘাটে। এই গ্রামের মেয়ে ঝি যাদের অন্য গ্রামে বিয়ে হয়েছে তারাও এখনো বাপের বাড়িতে আসলে এই ঘাটে ডুব দিয়ে স্নান করে। হৃদয় খুড়ে জাগিয়ে তোলে কিশোরকালের স্মৃতি। 

কাশীনাথপুর গ্রাম চাষাবাদে আধুনিক হয়েছে। কৃষিকাজের পাশাপাশি অন্যান্য পেশাতে অনেকে জড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার প্রসার বেড়েছে। গ্রামের মসজিদটি বেড়ার ঘর থেকে এখন দো’তলা ছাদ হয়েছে। গোরস্থান আর ঈদগাহ সংস্কার হয়েছে। বাড়িঘর আধুনিক হয়েছে। তবে মানসিকভাবে এখনো সংস্কার হয় নি তাদের। এখনো তারা একে অপরের ক্ষতি করার জন্যে পড়ে থাকে, এখনো গীবত করে নিজের চিন্তার বাইরে কেউ চললে। এখনো এদের নারীরা যুবতী, কিশোরীরা কৌতুহলী ঐ মায়াঘাটের মতো। তবে সবাইকে একটা সীমানা মেনে পথ চলতে হয়। আপন পুরুষ আর পর পুরুষের ধারণা এদের মগজে ঢোকানো হয় মাসিক শেষ হওয়া অব্দি। এদের কিশোর আর যুবকেরা প্রযুক্তির সন্তান। সারাদিনে সুযোগ পেলেই কীভাবে কিভাবে যেনো পুরো পৃথিবী ঘুরে আসে ইউটিউব আর গুগলের মাধ্যমে। মায়াঘাটের গল্প তাদের ভালো লাগে না। এইগুলো সেঁকেলে। 

আসলেই তো,  তা-ই। ঘাটের সাথে জীবনের সম্পর্ক থাকলেই তো না নিবিড়ভাবে মনে মেনেই বেড়ে উঠবে উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েরা। আগের কালের মানুষের যেমন নিবিড় সম্পর্ক ছিলো এই ঘাটের সাথে এখন তা নেই। এখন চাষাবাদের পানি সরবরাহ করা হয় বিদ্যুৎ চালিত পাম্পে, বাড়িতে পাম্প দিয়ে পানি তুলে শহরের মতো হয়ে গেছে অজু-গোসল আর নিত্যদিনের পানি ব্যবহারের ব্যাপারগুলো। দিন দিন এইঘাটের ব্যবহার তার অতীত প্রয়োজন হারিয়ে ফেলছে। ঘাটে এখন নৌকা চলে না, কোনো পাটনী নেই। সরকার ব্রিজ করে দিয়েছে। আগের মতো ঘাটে আর মাছ পাওয়া যায় না। আগে ঘাট মানুষের প্রয়োজন মেটাতো, ঘাটের কদর ছিলো। এখন প্রয়োজন মেটাতে পারে না তাই ঘাটের প্রতি দরদ নেই। 

তবে এখনো পাট পচাতে এই ঘাটের ব্যবহার রয়েছে। শুধু তাই নয় ইরিধানের বীজতলা দেওয়া - সেটার জন্যেও সস্তা আশ্রম হলো এই ঘাট। 

কাশীনাথপুরের বড়বাড়ির খুল্যে ঘাট, মায়ারঘাট, সাঁকোরঘাট – এইগুলো দিনে দিনে যেনো গল্পের পাতাতে চলে গেছে। শুধুমাত্র ঘাটের প্রতি যাদের কৌতুহল জাগে বা মুরুব্বীবের যারা একটু আগ বাড়িয়ে প্রসঙ্গক্রমে ঘাটের কথা বলে - কেবল তখন-ই এইসব ঘাট নিয়ে জীবন্ত কিচ্ছা উঠে আসে। মুরুব্বীরা মন খুলে গল্প বলে -  গল্পে নায়ক থাকে, নায়িকা থাকে, থাকে দৈব বিপদ সৃষ্টিকারী, থাকে দৈব বিপদ উদ্ধারকারীও। 

সেঁকালের মানুষেরা এখনো বিশ্বাস করে মায়াঘাটে এখনো দৈব শক্তি ডাক পাড়ে; বিপদের ডাক দেয়, বিপদ থেকে উদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়। মায়াঘাটে আজো বাঁশি বাজে। বাঁশির সুরে আজও ছুটে আসে কেউ কেউ। 

কতো উঠতি যুবক-যুবতীর প্রেম কাহিনী এই মায়াঘাটের বাঁশির সুরকে জড়িয়ে আছে, কতো রমণীর সাজানো গোছানো সংসার ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছে এই মায়াঘাটের বাঁশিতে – তা কেবল এই পাড়ের সেই মানুষেরা-ই ভালো জানে। একবার নাকি বিজনপুরের গণি মৌলভীর বউ এপাড়ের আক্কাচ সর্দারের ঘরে উঠেছিলো ভরা সংসার ফেলে – আক্কাচের বাঁশির সুরেই। কচি বয়সের ফুলভাণ যুবক হ্বিকমতের প্রেমে পড়েছিলো – এই মায়াঘাটের বাঁশির সুরেই। সেলিনা আজও হ্বিকমতের জন্যে মনে কোণে ফুলবিছানা সাজিয়ে রাখে – তা ও হয়তো এই মায়াঘাটের বাঁশির সুরে-ই। 

আজো মাঝরাতে সেলিনার ঘুম ভাঙে। মনে হয় রাত-বিরাতে হ্বিকমত তাকে বাঁশি বাজিয়ে ডেকে ডেকে মরছে। সেলিনা ঘর ছেড়ে আঁছড়িয়ে গিয়ে পড়ে তালগাছ তলে। সে আপনটানে ছুটে যায় – পায় না কেবল হ্বিকমতকে। 

মায়াঘাটে বাঁশি বাজে, সুর ভেসে ভেসে আসে, থাকে ছুটে চলার তাড়না – থাকে না কেবল কোনো বাঁশিওয়ালা। যার নামে যখন বাঁশি বাজে তখন সে ছুটে চলে; কেউ ঘরে ফেরে, কেউ ফেরে না – কখনো বাঁশীবাদক আবার কখনো সুরের বশে বশীভূত কোনো প্রাণ।   

কাশিনাথপুরের মায়াঘাট - এ যেনো কিংবদন্তীরও কিংবদন্তী। এই পাড়ের মানুষের মিলন বিরহ, জীবন যাপন আর বিশ্বাসের সাথে জড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত সাক্ষ্য।  

 আসিফ ইকবাল আরিফ
শিক্ষক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ। 
উগ্রবাদ প্রতিরোধে দরকার প্রগতির শিক্ষা ।। মো. সাজ্জাদ হোসেন

উগ্রবাদ প্রতিরোধে দরকার প্রগতির শিক্ষা ।। মো. সাজ্জাদ হোসেন


উগ্রতা হলো উচ্ছৃঙ্খলতা। উগ্রবাদ কোন বিশেষ মতবাদ নয়। উগ্রবাদ কোন দর্শনও নয়। মানুষের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য। উগ্রতা ব্যক্তির  আচরণিক বৈশিষ্ট। সব মানুষের মধ্যে উগ্রতা কাজ করেনা। অসংখ্য কারনে মানুষের মধ্যে উগ্রতা কাজ করতে পারে। খাদ্যাভ্যাস,পারিবারিক ও বংশগত,আবহাওয়া,সামাজিক নিয়ম কানুন ইত্যাদি কারণে মানুষের মাঝে উগ্রতা কাজ করতে পারে। উগ্র মানুষের স্বাভাবিক বোধ বুদ্ধি থাকেনা। উগ্রতা স্বাভাবিক বোধ বুদ্ধিকে নষ্ট করে দেয়। উগ্রতা পরিবার ও সমাজের শান্তি শৃঙ্খলা নষ্ট করে দেয়। উগ্রতা পরিবার ও সমাজের গন্ডি পেরিয়ে রাষ্ট্রের শান্তি শৃঙ্খলাও নষ্ট করে দিতে পারে। উগ্রবাদী মানুষের কারণে রাষ্ট্র ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। রাষ্ট্রকে অকার্যকর রাষ্টের তালিকায় নিয়ে যায় উগ্রতা। উগ্র মানুষ জিঘাংসা পরায়ণ। জিঘাংসার জন্য খুন,ধর্ষণ ও জীব হত্যার মত জঘন্য কাজে লিপ্ত হতে পারে উগ্র মানুষ। উগ্রতাকে বিশেষ  মতবাদ বলা গ্রহণযোগ্য নয়। উগ্রতা শুধুমাত্র ব্যক্তির আচরণ। তবে উগ্রতা ব্যক্তি থেকে পরিবার,পরিবার থেকে সমাজ এবং পুরো রাষ্ট্রকেই কলুষিত করতে পারে। উগ্রতা ব্যক্তি থেকে নিজস্ব সম্প্রদায়ের মধ্যেও ছড়াতে পারে। উগ্রতা ব্যক্তি থেকে যখন নিজস্ব সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পরে তখন মতবাদিক প্রশ্ন উঠতে পারে। 
একটি দেশের অভ্যন্তরে বসবাসকারী ও একই কৃষ্টি কালচার যারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে তারা সবাই ভাই ভাই। মা বাবার ভিন্নতা থাকতে পারে। মা বাবার ভিন্নতা থাকলেও দেশ মাতৃকা নিজের সন্তানকে কখনই আলাদা করেনা। ধনী,গরীব,সাদা,কালো,ধর্ম,বর্ণ কোন ভেদাভেদ মায়ের কাছে থাকেনা। সবাই দেশ মাতৃকার সন্তান। সবার মা বাংলা মা। বাংলা মা কখনও তার সন্তানকে আলাদা করে দেখেনা। 

রাষ্ট্র সবার জন্য সমান। কোন বিশেষ শ্রেণিতে কাউকে বিভক্ত করাটা রাষ্ট্রের পাশাপাশি সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব হতে পারেনা। রাষ্ট্রের সচেতন নাগরিক হয়ে কাউকে বিশেষ শ্রেণিতে বিভক্ত করে কোন বিশেষ নামে ডাকাও সমীচিন হবেনা। রাষ্ট্রের সকল নাগরিক ভাই ভাই। সকলের রক্তের রংই লাল। কোন রক্তকেই জাতি বা সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে আলাদা করা যায়না। কোন সম্প্রদায়ের যদি রক্ত ঝরে তাহলে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকই রক্তাক্ত হয়। সচেতন নাগরিক হিসেবে সবার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে সকল নাগরিকের অধিকার সমান। অনেক সময় স্বাধীন রাষ্ট্রে সবার সমান অধিকার দেখা যায়না। রাষ্ট্র তার নিরপেক্ষতা হারিয়ে ফেলে। সাধারণ জনগণের পাশাপাশি রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিরা জাতি ও সম্প্রদায় ভেদে বিভক্ত হয়ে পরে। রাষ্ট্র তখন সবার সমান অধিকার ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে পারেনা। 

উগ্রতা ব্যক্তি থেকে সমাজে,সমাজ থেকে নিজস্ব সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পরে। দলাদলি,গোষ্ঠী স্বার্থ ও ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে উগ্রবাদী ব্যক্তি এক নিমিষেই তার অশুভ চক্রান্তের কৌশল ছড়িয়ে দিতে পারে। অশুভ চক্রান্তে রক্তাক্ত হয় শুধু সাধারণ মানুষ। ভ্রান্ত ধারণায় বিশ্বাসী ব্যক্তি খুব সহজেই অপরাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয়। উদ্ভট,উশৃঙ্খল,অন্ধত্ববাদ ও কুসংস্কারে বিশ্বাসী ব্যক্তি শুধু নিজের ক্ষতিই করেনা। সাধারণ নাগরিকের পাশাপাশি রক্তাক্ত করে পুরো দেশ ও জাতিকে। ছাত্র ও তরুণ সমাজের মাঝে উগ্রতা ছড়িয়ে পড়লে সমাজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যেতে পারে। মাদক ও বখাটেপনার মতই উগ্রতা ছাত্র ও তরুণ সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। উগ্রতা থেকে ছাত্র ও তরুণ সমাজকে রক্ষা করাও সমাজের দায়িত্ব। উগ্রতার কারণে ঝরে যায় অনেক প্রাণ।

উগ্রবাদ যদিও কোন মতাদর্শ নয় তবুও উগ্রতা প্রতিরোধের জন্য রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের সমানভাবে ভূমিকা রাখা দরকার। উগ্রবাদ যদি মতাদর্শে পরিণত হয়ে যায় সেটা ক্যানসারের মত মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। ক্যানসার যেমন মানব দেহের সমস্ত কোষকে আকার্যকর করে দিতে পারে তেমন ভাবে উগ্রবাদ সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতিকে খুব সহজেই নষ্ট করে দিতে পারে। উগ্র জাতীয়তাবাদ দেশের সুনাম নষ্ট করে দেয়। সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষার জন্য প্রগতির চর্চা খুব জরুরী দরকার। সর্বক্ষেত্রে প্রগতির চর্চা ছাড়া সম্প্রীতির চিন্তা অবাস্তব। প্রগতির শিক্ষা সফল হতে পারে একমাত্র মাতৃভাষায়। মা,মাটি ও মায়ের ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তি উগ্রতায় লিপ্ত হতে পারেনা। মাতৃভাষা শিক্ষার মাধ্যমেই জাতিসত্তার পরিপূর্ণতা লাভ করে। নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে ভাতৃত্ববন্ধন আরও দৃঢ় হতে পারে। নিজের জাতিসত্তার সন্ধান করতে হলে ফিরে আসতে হবে মাতৃভূমির কাছে। ফিরিয়ে আনতে হবে বাঙালি জাতির অতীত ঐতিহ্যকে।  
আবুল ফজল বলেছেন “ মানুষ প্রগতিশীল। চিন্তার রাজ্যে প্রগতি না এলে কর্মের রাজ্যে কখনো প্রগতি আসতে পারেনা। আর চিন্তার বাহন হচ্ছে ভাষা ও সাহিত্য।”

মো. সাজ্জাদ হোসেন
প্রভাষক
লাউর ফতেহপুর ব্যারিস্টার জাকির আহাম্মদ কলেজ
নবীনগর,ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

Friday, November 19, 2021

 নারী নদী, সমুদ্র নয় ।।   নাজমুল হুদা পারভেজ

নারী নদী, সমুদ্র নয় ।। নাজমুল হুদা পারভেজ


মানুষের শরীরের পানি লবণাক্ত-

কান্নার জলদেহ ঝরা ঘাম এবং রক্তের স্বাদসবই।
সমুদ্রের জলও লবণাক্ততাই অজানা প্রবৃত্তি মানুষকে-
বারবার টেনে নিয়ে যায় সমুদ্র কিংবা নদীর কাছে।
যদিও নদী  সমুদ্র এক নয়পৃথক বৈশিষ্ট্য আছে।
যারা সমুদ্রের কাছে যেতে পারে না-
তারা ছুটে যায় নদীর কাছে,নদীতেই খোঁজে-
সমুদ্রের জলের লবণাক্ততাখোঁজে নীল জল।
কোন কোন কবির কবিতার উপমায় কিংবা তুলনায়
কবিতার পংক্তিমালায় নারী যদিও হয়ে ওঠে নদী।

একজন নারীর চোখে সমুদ্র খুঁজতে গিয়ে
ওর চোখের কৃত্রিম জল দেখে ভেবেছিলাম,
সত্যিই বুঝি সমুদ্র  নদীর মাঝে-
লবণাক্ততার অদৃশ্য কোন মেলবন্ধন আছে।
ওর চোখে চোখ রেখে দেখলাম-
ওর হৃদয়ে সমুদ্রের মতোই গভীরতা আছে,
বুঝলামওর চোখের জলেও লবণাক্ততা আছে।
কিন্ত বিশাল এক পার্থক্য খুঁজে পেলাম,
সমুদ্রের জল নীল আর ওর চোখের জল ঘোলাটে।

সমুদ্রের বিশালতা সীমাহীন আকাশ ছুঁয়ে যায়
কিন্ত ওর হৃদয় নদীর মতোই ছোট  বহমান।
ওকে সমুদ্র ভেবেআমি তাই ভুল করলাম,
কারণ  আমাতে স্থির থাকল না।
একদিন নদীর জলের মতোই বয়ে গেল অজানায়,
অবশেষে বুঝলামওর রক্ত লাল  রং টা ঘোলাটে বলেই-
 মানুষঅতি সাধারণ মানুষ।
আর মানুষ বলেইওর চোখের জলে প্রতারণা আছে,
মানুষ বলেইনদীর জলের মতো রং বদলায় প্রতিনিয়ত।
 চিরকালই নদীবদলে যাওয়া নদী,রং বদলানো নদী,
তাই আমৃত্যু  বেঁচে থাকবে আমার হৃদয়ে-
নদী হয়েসমুদ্র হয়ে নয়।
উপলব্ধিতে আমার কবিতার পংক্তিমালায় লিখে যাব
নারী সব সময়ই নদীকখনই নারী সমুদ্র  হতে পারে না।